নকল প্রসাধনী ছড়িয়ে দিচ্ছে দেশি-বিদেশি চক্র :
আপডেটঃ 5:23 pm | August 18, 2019
আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের জনপ্রিয় প্রসাধনীর খালি মোড়ক আমদানি করছে একটি চক্র। তাতে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ ভরে বিক্রি করা হচ্ছে পাড়া-মহল্লার দোকানসহ বড় বড় শপিং মলেদেশে নামিদামি ব্র্যান্ডের সুদৃশ্য মোড়কে নকল প্রসাধনী বিক্রি হচ্ছে। এ কাজে জড়িত রয়েছে দেশি-বিদেশি একাধিক চক্র। এসব চক্র আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের জনপ্রিয় প্রসাধনীর খালি মোড়ক আমদানি করে তাতে ক্ষতিকর রাসায়নিক ভরে নকল প্রসাধনী তৈরি করছে।

আর এগুলো পাড়া-মহল্লার দোকানসহ বড় বড় শপিং মলে বিক্রি করছে। ব্যাংকিং চ্যানেল এড়িয়ে অবৈধ এ ব্যবসার লেনদেন হচ্ছে। দলের নেতারা এখান থেকে কোটি কোটি টাকা আয় করলেও তা পাচার করে দিচ্ছে। সম্প্রতি নকল প্রসাধনী সম্পর্কিত শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের তৈরি প্রতিবেদনে এসব তথ্য উল্লেখ আছে।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান কালের কণ্ঠকে জানান, উপজেলার ছোট-বড় দোকানসহ রাজধানীর বড় বড় শপিং মলে অপরাধী চক্র সুকৌশলে নকল প্রসাধনী বিক্রি করছে। অবৈধ ব্যবসায়ে সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাছে। প্রকৃত ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সেই সঙ্গে ভোক্তারা প্রতারিত হচ্ছে। তবে শুল্ক গোয়েন্দারা এ বিষয়ে কঠোর নজরদারি করছেন বলে তিনি জানান।
সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর দিনব্যাপী অভিযান চলিয়ে ডেমরার শিমরাইলে ২০ কোটি টাকা মূল্যের বিদেশি কসমেটিকস উদ্ধার করেছে। এ ব্যাপারে ড. মইনুল খান জানান, র্যাবের সহায়তায় মুনস্টার লিমিটেড নামে একটি কম্পানির তিনটি গুদামে অভিযান চালিয়ে খালি (মোড়ক) বোতল উদ্ধার করা হয়। যেগুলোর গায়ে লেখা মেইড ইন ফ্রান্স, মেইড ইন আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের নাম। এগুলো আনতে গিয়ে ১৯টি ট্রাক ব্যবহার করতে হয়েছে।
ড. মইনুল খান আরো জানান, এক সপ্তাহ আগে চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ প্রায় ১০ কোটি টাকা মূল্যের ৫৫ হাজার কার্টন সিগারেট জব্দ করে। ওই ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে মুনস্টার গ্রুপের নাম বেরিয়ে আসে। ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক বেলায়েত হোসেন। মুনস্টার কম্পানি দীর্ঘদিন থেকে নামে-বেনামে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে নকল মোড়কে পণ্য বাজারজাত করে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, গোল্ডেন রোজ, ম্যাক, লোরিয়েল, আরটিসটি, সেফোরা, ডাব, ডাইওর, ডুইট, জাভান, কোবরা, রয়্যাল, ফগসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের প্রসাধনীর খালি মোড়ক আমদানি করছে এ দেশের একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। বিভিন্ন দেশের অসাধু চক্র এসব খালি মোড়ক সরবরাহ করছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মিথ্যা ঘোষণায় এসব মোড়ক আনা হচ্ছে। আবার স্থলপথে ভারত থেকেও প্রচুর মোড়ক আসছে। মোড়কের গায়ে সব ধরনের সিল, উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ হিসাব কষে দেওয়া থাকে। এসব মোড়ক এত বেশি নিখুঁতভাবে তৈরি যে প্রকৃত পণ্যের চেয়ে কোনোভাবেই আলাদা করা যায় না।
পুরান ঢাকা, গাজীপুর, ডেমরা, টঙ্গী, যাত্রাবাড়ী, সাভার, কেরানীগঞ্জসহ রাজধানীর আশপাশে বড়সড় আয়োজনে গুদামঘরের মতো বড় কারখানায় কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী দিয়ে ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশিয়ে প্রসাধনীর নামে নকল প্রসাধনী পণ্য তৈরি করা হচ্ছে। এসব কারখানা সম্পর্কে অনেক সময় স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অসাধু কিছু সদস্য অবহিত থাকেন। অসাধু ব্যবসায়ীরা নিরাপদে এ অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যেতে মোটা অঙ্কের অনৈতিক সুবিধা দিয়ে থাকে এই সদস্যদের। বিনিময়ে তাঁরা এ অবৈধ কাজে বাধা দেন না। বরং অন্যরা যাতে বাধা না দেয় সেই ব্যবস্থাও করে থাকেন। বন্দর ও সীমান্তপথে বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর নামিদামি ব্র্যান্ডের প্রসাধনীর মোড়ক অবৈধ ব্যবসায়ে জড়িত অসাধু ব্যবসায়ীদের এজেন্টরা বিদেশি চক্রের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে গ্রহণ করে নিরাপদে দেশের মধ্যে গুদামে পৌঁছে দেয়।
নকল প্রসাধনী তৈরির কারখানা রাজধানী থেকে কম ব্যয়বহুল এলাকায় হলেও এসব ব্যবসার হোতারা থাকে রাজধানীর বিলাসবহুল এলাকায়। গুলশান, বারিধারা, বনানী, ধানমণ্ডি, উত্তরার মতো অভিজাত এলাকায় এই অসাধু ব্যবসায়ীদের বেশির ভাগের বসবাস। এই ব্যবসায়ীদের বেশির ভাগেরই আরো একাধিক ব্যবসা রয়েছে। তারা ঘন ঘন বিদেশে আসা-যাওয়া করে। এই ব্যবসায়ীদের আয়কর রিটার্নে দেওয়া তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে। এ ক্ষেত্রে স্থাবর, অস্থাবর সম্পদ এবং নগদ অর্থের লেনদেন পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন। এ অবৈধ ব্যবসায়ে দলের নেতার সঙ্গে এজেন্ট বা কর্মীদের সাক্ষাৎ হয় না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মোবাইলে নির্দেশ পৌঁছে যায় দলের বিভিন্ন স্তরে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিকল্পিত এ ব্যবসা দেশব্যাপী দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে আসছে বড় মাপের অসাধু এই ব্যবসায়ীরা। পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণসহ তাদের আটকের চেষ্টায় কাজ করছেন শুল্ক গোয়েন্দারা। ব্যাংকিং চ্যানেল এড়িয়ে লেনদেন হয় অবৈধ এ ব্যবসায়ে। এ ক্ষেত্রে দেশের ব্যবসায়ীরা এ ব্যবসা থেকে অর্জিত অর্থ পাচার করে থাকে। তবে কারখানায় মোড়ক পৌঁছানো, কারখানা থেকে বিভিন্ন দোকানে এজেন্ট হিসেবে পণ্য বিক্রি করা, পণ্য পরিবহনসহ বিভিন্ন কাজে লেনদেন হয় বিকাশ ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নকল প্রসাধনীতে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক মার্কারি অতিরিক্ত পরিমাণে ব্যবহার করছে। এ রাসায়নিকের সঙ্গে আরো কিছু ক্ষতিকর রাসায়নিকও ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব রাসায়নিক ব্যবহারে মানবদেহের ফুসফস, চামড়ায় মারাত্মক ক্ষতি হয়। দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে পারে।
তথ্যসূত্র: অনলাইন।


