‘য্যাগলা লাশের কেউ নাই স্যাগলাত মোর লছ হয় ভাই’

প্রকাশিত: ১:৫৯ পূর্বাহ্ণ, জুন ১৬, ২০২০

‘য্যাগলা লাশের কেউ নাই স্যাগলাত মোর লছ হয় ভাই’

জাহাঙ্গীর কবির তনু: ছয়দিন ধরি লাশটা ফ্যানের সাথে ঝুলছে, কেউ ধরেনা গরমে পঁচি গেছে পোকা ধরছে- মুই নিজ হাতে নামাছোম থানাত নিয়া গেছম’ এভাবেই লাশ বহনের গল্প বর্ননা করলেন ছকু। বাষট্টি বছরের শীর্ন আর লম্বাটে আদলে গড়া ছকু ৩৮ বছর ধরে গাইবান্ধা থানায় লাশ বহনের কাজ করছেন।

৮১ সালে গাইবান্ধা থানার দাপুটে ওসি জাকির হোসেন রিক্সাচালক ছকুকে থানায় ডেকে লাশ পরিবহনের দায়িত্ব বুঝে দেন। সেই থেকে ৩৮ বছর পলাশবাড়ী, সাঘাটা, ফুলছড়ি, গাইবান্ধা থানা এলাকার খুন-খারাবি, আত্মহত্যা, জলে ডোবা, বন্দুক যুদ্ধে নিহত মানুষের মৃতদেহ বহনের দায়িত্ব ভার ছকুর।

অনেক সময় পুলিশের ডাকে মাঝরাতে একা লাশ নিয়ে ফেরে। ভয় ডর করেনা কখনও। উস্কোখুস্কো চুলে আগুন ঢালা চোখে ঘন-গাঢ় অন্ধকার ঠেলে ডেডবডি নিয়ে চলে আসে সদর থানায়। লাশের সাথে কোন স্বজন আসেনা। ছকু জানে মানুষ মরে গেলে একদম একা হয়ে যায়।

ছকু কোনদিন ভয়পায়নি। রাত গভীরে লাশ নিয়ে ফিরতে হঠাৎ ভ্যান খারাপ হলে জনশুন্য প্রশস্ত রাস্তায় জমাট বাঁধা অন্ধকারে লাশের সাথে একাই কেটেছে তার।

শহরের পুর্বপাড়ায় ভগ্নিপতির ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানে ১৪/১৫ বছরের ছেলেটা কাজ করতো, ইনডিল পানে সে মারা যায়-এটা ছকুর প্রথম লাশ। ছেলেটার মুখ খুব মনে পরে।

কবর থেকে পঁচাগলা দেহ তাকে একাই তুলতে হয়। কেউ ধরেনা। নাকে কেরোসিন মেখে বাসি লাশ তুলে সরকারি ব্যাগে ভরে চলে যায় মর্গে। পূঁজ-রক্ত ঔষুধ, গজ-ব্যান্ডেজ, বাতাসে লাশের গন্ধ ছকুর ভীষন পরিচিত।

সংশ্লিষ্ট থানার কর্মকর্তা ছকুকে পরিবহন খরচ প্রদান করেন।তাছাড়া মৃতের স্বজনরা বকশিস দেন।

‘য্যাগলা লাশের কেউ নাই (বেওয়ারিশ)স্যাগলাত মোর লছ হয় ভাই’ বেওয়ারিশ লাশ পরিবহনে থানার টাকাতেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়।ডোমের টাকা তার হাত দিয়ে দেওয়া হয়। লাশ কাটার আগেই বুঝে দিতে হয় তাকে। ছকু দেখেছে মৃতের দেহ চিড়ে ফেলা হয় পুরোনো সব অস্ত্রে। ইচ্ছে করেই নোতুন কেনা হয় না।

বন্দুক যুদ্ধে মরে যাওয়া মানুষের খবর পেলে ছুটে যায় ছকু মিয়া। বুকে মাথায় গুলি লাগা দেহ নিয়ে মর্গে হাজির হয়। বন্দুক যুদ্ধের মরা টানাটানিতে পুলিশ যা পারিশ্রমিক দেয় তাতেই সন্তুষ্টি।

সাত-আটজনের সংসারে মনপাষান ছকু একটা বয়স্ক ভাতার কার্ড পাবার আশা করেন।

কয়েকমাস যাবৎ তার শারিরীক অবস্হা অবনতির পথে।সামান্য পরিশ্রমে ক্লান্তি অবসাদ ছেয়ে অাসে।ঘুসঘুসে জ্বর বাসা বেঁধেছে নির্বিবাদে। পুলিশের কর্তাব্যাক্তিদের কাছে তিন যুগের লাশ ঠেলা মানুষটা ভাতা কিংবা রেশনের জন্য আকুতি

জানায়।

মৃতদেহ নিয়ে থানা হয়ে মর্গে আসা পর্যন্ত্য ভ্যান ভাড়া ১৫০০/টাকা। কোন মাসে ২/৩টি লাশ হলেও কোন কোন মাস ফাকা থাকে।ফাকা মাসে সে মহাফাপরে, নুন আনতে পান্তা ফুরায়। লাশ টেনে সমাজের উপকার করলেও ছকু মানুষের কাছে অপাংক্তেয়। একপ্রকার ঘৃনা থেকেই লাশ টানা ভ্যানে কোন যাত্রী উঠেননা।



⤴সংবাদটি 9875 বার পঠিত/ শেয়ার করে সংবাদের সাথে থাকুন,
সংবাদটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •